নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (রাজউক) নামসর্বস্ব ও ভুঁইফোড় বিভিন্ন গণমাধ্যমের কথিত সাংবাদিকদের উপদ্রব আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনো প্রকার পেশাদারিত্ব ছাড়াই শুধু ‘প্রেস’ লেখা আইডি কার্ড ঝুলিয়ে প্রতিদিন শত শত ব্যক্তি রাজউক ভবনে ভিড় করছেন। তথ্য সংগ্রহের নামে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্ল্যাকমেইল এবং চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এসব কথিত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। এদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে রাজউকের স্বাভাবিক দাপ্তরিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যার চূড়ান্ত ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ সেবাগ্রহীতারা।
কার্যক্রম বিঘ্নিত ও হয়রানি:
রাজউকের বিভিন্ন জোনের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন সকাল থেকেই নকশা অনুমোদন, পরিদপ্তর ও এস্টেট শাখাগুলোতে কথিত সাংবাদিকদের আনাগোনা শুরু হয়। অনেক সময় তারা কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই কর্মকর্তাদের কক্ষে দলবদ্ধভাবে প্রবেশ করে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকেন। ভবনের বিভিন্ন ফাইল ও সাধারণ মানুষের নকশা অনুমোদনের কাগজপত্রের ত্রুটি খোঁজার চেষ্টা করেন তারা। কোনো ত্রুটি পেলেই ‘রিপোর্ট করার’ বা ‘লাইভ করার’ হুমকি দিয়ে আর্থিক সুবিধা দাবি করা হয়।
সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি:
কথিত এই সাংবাদিকদের মূল লক্ষ্য থাকে রাজউকে আসা সাধারণ মানুষ ও ভবন নির্মাতারা। নকশা অনুমোদন বা ভূমির ছাড়পত্র নিতে আসা ব্যক্তিদের বিভিন্ন আইনি জটিলতার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। অনেক সময় রাজউকের কিছু দালাল চক্রের সাথে হাত মিলিয়ে এরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়। ফলে সাধারণ নাগরিকরা রাজউকে আসতে এবং সেবা নিতে রীতিমতো আতঙ্ক বোধ করছেন।
পেশাদার সাংবাদিকতায় নেতিবাচক প্রভাব:
এই ভুয়া ও কার্ডধারী সাংবাদিকদের কারণে মূলধারার পেশাদার গণমাধ্যমকর্মীরাও রাজউকে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে নানামুখী বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অতীতেও একাধিকবার সরকারি দপ্তরগুলোতে এই ধরনের অপসাংবাদিকতা ও চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
রাজউকের মতিঝিল প্রধান অফিসের উপ-পরিচালক পলাশ সিকদার, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পরিচালক , অথরাইজড অফিসার ,উপ-পরচালক (এস্টেট),বেশ কয়েকজন ইমারত পরিদর্শকের সাথে কথা হয় কালের অনুসন্ধানের।
তারা বলেন, “এরা প্রকৃত সাংবাদিক নন। এদের যন্ত্রণায় টেবিলে শান্তিতে কাজ করার পরিবেশ থাকে না।” এছাড়াও নানান ধরনের উদভট কথা বলে সংবাদ প্রকাশের কথা বলে। তাদের সাথ জড়িত হয় এক শ্রেণীর দালাল। যারা অপিসারদের গ্রামের বাড়ির ঠিকানা ও পরিবারের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রাহ করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটে নেয়ার চেষ্টা করে। তুলনামূলক সৎ,যোগ্য ও কর্মনিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্মানহানিকর তথ্য দুর্নিতীদমন কমিশন, ঊর্ধ্বতনা কতৃপক্ষকে জানিয়ে চাকুরি খেয়ে দেয়া,প্রমোশন আটকানোসহ নানা কুটকৌশল করে। এসবকিচুর ভয় দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়াই এসব কথিত কার্ডধারী সাংবাদিকদের নিত্য নৈমিত্তিক কর্মকান্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোকলজ্জা আর সামাজিক সম্মানের দিকে তাকিয়ে বেশিরভাগ কর্মকর্তা এসব বিষয়ে চেপে যান। এইরকম বেশ কয়েকটি নামসর্বস্ব অনলাইন থেকে একই বিষয় বারবার লিখে একাধিকবার চাঁদা দাবী করা হয় তার কাছে। চাঁদা না দেয়ায় তারাই আবার লিখিত অভিযোগ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। পরে সেখান থেকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়া হয়। যেখানে আনিত অভিযোগ মিথ্যা প্রমানিত হয়। এভাবে বছরের পর বছর ধরে ভুক্তভোগী হচ্ছেন রাজউকের বহু কর্মকর্তারা।
পলাশ সিকদার বলেন, সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। সত্য ঘটনা বা বিষয় উঠে আসে পত্রিকার পাতায়। সমাজের আয়না বলা হয় সংবাদ মাধ্যমকে। কারন যে বিষয় যেভাবে ঘটবে সে বিষয়টি সেভাবেই উপস্থাপন করা হবে এটাই জনগণের প্রত্যাশা। একজন ক্ষুদ্র সরকারি চাকুরিজীবী হয়ে আমরা চাই কর্মস্থলে নিজেদের নিরাপত্তা। সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার। তাই গণমাধ্যম এর নেতৃবৃন্দের প্রতি আবেদন থাকবে, যেনো সঠিক তথ্য তুলে ধরা হয়।
কর্তৃপক্ষের (রাজউক চেয়ারম্যান) পদক্ষেপের দাবি
ভুক্তভোগী কর্মকর্তা ও সেবাগ্রহীতাদের দাবি, রাজউক ভবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তা নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তথ্য অধিদপ্তরের (PID) অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বা মূলধারার গণমাধ্যমের বৈধ পরিচয়পত্র ছাড়া তথ্য সংগ্রহের নামে যত্রতত্র প্রবেশাধিকার সীমিত করার সময় এসেছে। একই সাথে ডিজিটাল নজরদারি ও সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে এই চক্রটিকে চিহ্নিত করে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি উঠেছে।
এদিকে গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিক নেতারা বলছেন, এমন কার্ডধারী কথিত সাংবাদিকদের জন্য মূলধারার গণমাধ্যমে কর্মরতরা পড়েছেন বিপাকে। আমরা দাবি জানাবো দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকার এসব কথিতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিবে।
জানতে চাইলে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, এসব বিষয় অবহিত করনে প্রকৃত গণমাধ্যম কর্মীদের ধন্যবাদ জানাই। ভুঁইফোড় এসব কার্ডধারীরা যাতে রাজউক ভবনে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য দ্রুত সময়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।